Homeইতিহাসরোমীয় সভ্যতা (The Roman Civilization)

রোমীয় সভ্যতা (The Roman Civilization)

 

রোমীয় সভ্যতা (The Roman Civilization)

রোমক সভ্যতা নামে বহুলভাবে বিদিত। আর এই সভ্যতার উন্মেষ ঘটে গ্রিক সভ্যতার গৌরব বিবর্ণ হওয়ার বহু পূর্বে। ইটালির টাইবার নদীর তীরে ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়ে সমস্ত বিশ্বে এর প্রভাবচ্ছটা বিকিরিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা- সাহিত্য, স্থাপত্যকলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে।

দেশ ও সমাজ : ৭৫৩-৫১০ খ্রিষ্টপূর্ব যুগে রোমে রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের পট পরিবর্তনের পর রোমে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নানা উত্থান-পতনের এক পর্যায়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে রাজা জুলিয়াস সিজার ক্ষমতা গ্রহণ করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একজন প্রতিভাবান শাসক ছিলেন। রাজনীতিবিদ, বাগ্মী ও আইন প্রণেতা হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল। জুলিয়াস সিজার নিহত হওয়ার পর অগাস্টাস সিজার ক্ষমতায় আসেন। তিনি বিখ্যাত অগাস্টাস যুগের সূচনা করেন। ৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথম রোমান সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অগাস্টাস সিজার নিজকে রোমান ধর্ম ও সামরিক ক্ষেত্রেরও প্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন। যুদ্ধ ও বিপ্লবে বিধ্বস্ত রোমের সমাজজীবন ভালো ছিল না। অধিকাংশ রোমবাসীই ছিল অশিক্ষিত। যুদ্ধ ও কৃষিকাজ ছিল প্রধান জীবিকা। কারিগরি শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার তেমন ব্যাপ্ত ছিল না। তবে স্টোরিক দর্শনের প্রভাবে মুক্ত শ্রম বাজার, সৃষ্টি হয়। ফলে দাসত্ব প্রথার অবসান ঘটতে থাকে। মুক্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়। এরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায় গড়ে তোলে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সমাজে অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। সমকামিতা সমাজে একটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়। সমাজে উৎপীড়ন ও অপরাধের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধি পায়

ধর্মবিশ্বাস : সাম্রাজ্যিক রোমে দেব-দেবীর প্রচলন ছিল। রোম সম্রাটকে ঈশ্বরতুল্য পূজাও করত। অগাস্টাসের রাজত্বকালে যীশু খ্রিস্টের জন্মগ্রহণের ফলে পৃথিবীতে নতুন ধর্মমতের সূচনা হয়। ভালোবাসা, ক্ষমা ও শান্তির বাণী বহনকারী মাত্র ৩০ বছর বয়সে যিশুর প্রচেষ্টায় খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। সম্রাট কনস্টানটাইনের আমলে রোমে খ্রিষ্টধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা লাভ করে। ফলে এ নতুন ধর্মের অনুকূলে রোমান সাম্রাজ্যে প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় ।

অর্থনৈতিক জীবন : রোমের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত ছিল। সুউচ্চ হর্মরাজি, দিগন্ত বিস্তৃত শস্য শ্যামলাময় মাঠ জনসাধারণের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক বিবেচনা করা হয়। কৃষি ও শিল্প ছিল রোমের মূল অর্থনৈতিক উৎস। প্রচুর খাদ্যশস্য ও সবজি উৎপাদিত হতো। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও হাঁস-মুরগির খামার গড়ে উঠেছিল। রোমান সাম্রাজ্যে জনসাধারণ প্রচুর শিল্প-কারখানা পরিচালনা করত। আসবাবপত্র, যুদ্ধাস্ত্র এবং ব্রোঞ্জ ও লৌহজাত দ্রব্য রোমের কারখানাগুলোতে তৈরি হতো। ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে পশমি বস্ত্রবয়ন ও মৃৎপাত্র প্রস্তুত করা হতো। রোম সভ্যতার জনসাধারণ ভারত ও চীনের মতো দূরবর্তী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ভারত থেকে তারা মসলা, দামি পাথর, চন্দন কাঠ প্রভৃতি আমদানি করত। চীন থেকে রোমানরা রেশমি আমদানি করত। রোমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গিল্ডের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের কারিগর, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীগণ একত্রিতভাবে যে সংগঠন করে একে গিন্ড বলা হতো। রোম সরকার কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে উৎসাহ প্রদান করত। রাস্তাঘাটের উন্নতি সাধন করে সম্রাট অগাস্টাস সীজার বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ সুগম করেছিলেন

 

স্থাপত্য ও ভাষ্কর্য : রোমের বিশাল ও জমকালো ইমারতগুলো রোমীয় সাম্রাজ্যের শক্তি ও প্রাচুর্যের বহিঃপ্রকাশরূপে দণ্ডায়মান। রোমে স্থাপত্যকর্মে কংক্রিটের ব্যবহার ইমারত নির্মাণে বিপ্লব সাধিত হয়। কংক্রিটে শক্তভাবে পাথর জোড়া লাগাত। ফলে খিলনি ও গম্বুজ নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। উল্লিখিত প্রযুক্তি ব্যবহারের দ্বারা সুন্দর সুন্দর গির্জা, থিয়েটার, স্নানাগার, গৃহ প্রভৃতি নির্মাণ করে স্থাপত্য শিল্পে তাদের নিপুণতা প্রদর্শন করেছে। ৮০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট-টিটাস কর্তৃক নির্মিত কলোসিয়াম, নাট্যশালা হয়েছিল, সেখানে একসঙ্গে ৫৬০০ জন দর্শক বসতে পারত। স্থলভাগের দৃশ্য, গির্জার দেয়াল চিত্রায়নে, বাইবেলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণে এবং সাধু পুরুষদের জীবন বৃত্তাত্ত সংবলিত পুস্তকাবলি অলঙ্করণে রোমানরা পারদর্শী ছিল। রোমের ভাস্কর্য হিসেবে দেবতা, রাজা ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের প্রস্তর নির্মিত আবক্ষ নির্মাণে সবিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল।

ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি : রোমীয়রা তাদের যোগ্যতা বলে গ্রিক ভাষা, বিজ্ঞান শিক্ষা কলার সাথে বহুপূর্বেই পরিচিত হয়েছিল। গ্রিস দখল করার পর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায় ৷ সম্ভবত সেকারণেই রোমীয় সংস্কৃতিতে হেলেনীয় সংস্কৃতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ অব্দের শুরুতে রোমে লিখন পদ্ধতির প্রচলন হয়েছিল। তাদের এ লিখন পদ্ধতি আইন ও চুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো। তাদের বিভিন্ন সমাধির দেওয়ালে রোমান লিপি পাওয়া যায়। ইতঃপূর্বে রোমানগণ প্রথম গ্রিক, বর্ণমালার ভিত্তিতে ল্যাটিন বর্ণমালা চালু করেন। বর্ণমালা সৃষ্টির ফলশ্রুতিতে তদীয় সভ্যতার অগ্রযাত্রা সাধিত হয়। অগাস্টাস সিজারের সময় রোমে ল্যাটিন ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে এবং চরম উন্নতি সাধিত হয়। ফলে সমগ্র রোমের অধিবাসীদের এ ভাষা চর্চা করতে হয়। ল্যাটিন ভাষা থেকেই উন্নতি ঘটিয়ে আধুনিক ফরাসি, জার্মান ও স্পেনিশ, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা নিজ স্বরূপ লাভ করে। সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনে রোমান অগ্রযাত্রা অভাবনীয়। রোমান সাহিত্য দর্শনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। গ্রিক কবি হোরাস ও ভার্জিলের লেখনিতে এপিকিউরীয় ও স্টোয়িক দর্শনের প্রভাব বিদ্যমান। ভার্জিলের অসামান্য রচনা কর্ম ‘ইনিড’ বহুভাষায় অনূদিত হয়েছিল। ওভিদ ও লিভি সমকালীন রোমের খ্যাতিমান কবি ছিলেন। রোমান আইনের ব্যাখ্যা : সভ্যতার ইতিহাসে রোমানদের সবচেয়ে গৌরবজনক অবদান ছিল আইনের ক্ষেত্রে। যুক্তি ও প্রথার সম্মেলনেই রোমান আইনের সৃষ্টি। সেকারণেই এ আইনের বস্তুনিষ্ঠ কার্যকারিতা লক্ষণীয়। প্রাথমিক যুগে মৌলিক আইন দ্বারাই রোমানরা তাদের সমস্যা মিটাত। ৪৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ১২টি ব্রোঞ্জ পাতে সংকলিত আইনের দৃষ্টিতে সাম্যের স্বীকৃতি ছিল। সাম্রাজ্যিক রোমে আইনের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়। বেসামরিক আইন, জনগণের আইন ও প্রাকৃতিক আইনের আওতায় সমগ্র রাজ্য শাসিত হতো। নিরপেক্ষ, উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আইনগুলোতে দেখা যায় ৷ জ্ঞান-বিজ্ঞান : বিজ্ঞানমনস্ক রোমীয়রা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সবিশেষ অবদান রাখেন। পৃথিবীর ঘূর্ণন প্রক্রিয়া, লিপিয়ারের বাস্তব ধারণা রোমানদের সৃষ্টি। চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা, চিকিৎসক নিয়োগ একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গড়তে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। গ্যালেন ছিলেন সে যুগের একজন ইতিহাস প্রসিদ্ধ চিকিৎসক। প্রকৌশল বিদ্যায় রোমানরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। রাজনৈতিক আদর্শ, আইন, সামরিক সংগঠন ও প্রকৌশল বিদ্যায় অভাবনীয় উন্নতি ছিল রোমান সভ্যতার মূল কথা। জনগণের ইচ্ছাই যে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণের চালিকাশক্তি সে ধারণা রোমানদের সৃষ্টি। জৌলুষ ও প্রতিপত্তির দিক দিয়ে এটি ছিল অনন্য সভ্যতা। এ সভ্যতার আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয়ে বাইজান্টাইন সভ্যতা গড়ে ওঠে। সুতরাং যুগ-সমাজের আবহে রোম সভ্যতার সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা জগৎবাসীকে সম্মুখপানে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল।

প্রশ্ন:  রোমান সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা কর ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments